[ কবি কমল চক্রবর্তীর কবিতার বইয়ের আলোচনা ]
শংকর লাহিড়ী
কবি কমল চক্রবর্তীর কবিতার বই ‘ছায়ানৌকো’ । কৌরব থেকে
প্রকাশিত পরীক্ষা-সাহিত্য পর্যায়ের নবতর
সংযোজন । গত বছর কলকাতা বইমেলা-২০১০ এ কমলদার হাত থেকেই পেয়েছিলাম ঐ বই। আটচল্লিশ
পাতার পেপার ব্যাক। সেই নৌকোর পেছনে লেখা ‘অনন্ত
থেকে অনন্তর কালে ছড়িয়ে যায় কবিতার ছায়া।’ আর
নৌকোর ভেতরে ছায়ায় প্রথম পাটাতনে কমলদারই
হাতে লেখা আমাকে নিবেদিত অক্ষরমালা : ‘শঙ্কর কে আমার যা যা / এ জীবনের / ভুল, ভালবাসা /
কমল দা / ০৬-০২-১০ / ব. মে।’ – তো এইখান থেকেই আমি বইটা
পড়া শুরু করি।
প্রায় এক বছর পরে এই বইটা আবার পড়তে বসে আজ মনে পড়ছে
বহুদিন আগে কমলদার সাথে এক নৌকোয়, বুড়ি বালাম নদীর টালমাটাল জোয়ারে, চাঁদিপুরে।
সেই সব অনেক সূর্য গ্রহণের দিন, ঝাউবন, শেষ বিকেলের ঝড়। আমরা এক নৌকোয়। সেই সব
দিনের আলোছায়া, তার কুঁড়ি ও কঙ্কর, মদ-মাংস, তন্ত্র-নিম। ক্রমশঃ যা ক্যানভাসে,
রঙ-তুলিতে। কবি কমল চক্রবর্তীর কলমে। আশির দশকে রচিত সেই সময়ের কবিতাগুলো নিয়ে প্রকাশিত
হয়েছিলো কৌরবের পরীক্ষা–সাহিত্য সিরিজের দারুণ একটা বই, যার নাম ‘মিথ্যেকথা’।
এতদিন পরে সেই কলমেই ‘ছায়ানৌকো’। খুব আগ্রহ নিয়ে বইটা খুলে আমি প্রথমেই হোঁচট খাই। প্রকাশকের
কথায় ‘এই বই বৃক্ষনাথ–এর’! - না,
আমি বৃক্ষনাথ বুঝি না। আমি জানি এই বই কবি কমল চক্রবর্তীর। তাকে বৃক্ষনাথ বলার
চেয়ে আমি বরং শাল-সেগুনের জঙ্গলকে কমলনাথ বলতে রাজি আছি। ফার্নেস, জল, মিথ্যেকথা, সরলরেখা,
আর ছায়ানৌকোর কবি কমল।
ছায়ানৌকো বইটা নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল অসীম, কিছুটা
দ্বিধাও। কারণ, বলা হয়েছিলো এর কবিতাগুলোর পরীক্ষিত সত্য হোল এগুলো কমল চক্রবর্তীর
পুরনো কবিতারই ‘নবরূপ’। কারণ, ‘নতুন নির্মাণ সম্ভব ছিল না’ ! – এ এক রোমাঞ্চকর ও
নতুন পরীক্ষা যা প্রকৃতই বিপদজনক, আমার মনে হয়েছিলো। নিজেরই পুরনো কবিতাগুলো পড়ে
অবচেতনের অচিন কুঠুরিগুলোতে নিজেরই মুখোমুখি হয়ে আজ এত বছর পর কবিকে পুনরায় নতুন
কোরে সাজিয়ে তুলতে হচ্ছে তার হারিয়ে যাওয়া লুপ্ত স্মৃতির বোধের অনুভবের শব্দমালার অক্ষরের
হর্ষ ও বিষাদ। এই মতো তার স্কিম। -‘যে কবিতা তিরিশ চল্লিশ বছর আগের, তাকে অন্য
মেধা ও অক্ষরে পুনর্নির্মাণ’।
বইয়ের শুরুতেই আট পাতায় আটটি পৃথক প্রস্তাবনায়
(ছায়ানৌকো – ১,২,৩,৪,৫,৬,৭,৮) দীর্ঘ ভনিতা রয়েছে, যা আমাকে ক্রমশঃ সন্দিহান করে।
কেননা আমি চেয়েছিলাম পুরনো লেখার রিমেক নয়, বরং আজকের কমল চক্রবর্তীর একটা পূর্ণ
রচনা যার ক্যানভাসে আছে তার সময়োপযোগী শস্যভাণ্ডার, মদ ও ময়ূর। ব্যক্তিগত জীবনের
ধূসর ক্যানভাসে কীভাবে আবার সেজে উঠছে রঙ, শুরু হচ্ছে আর একটা র্যাপিড ফায়ার
রাউন্ড।
বইয়ের শুরুতে ঐ টুকরো গদ্যগুলোয় রয়েছে ‘যশলোভী
খ্যাতিলোভী হামবাগ’ কবিদের বিরুদ্ধে জেহাদ। কবি কমল আঙুল তুলেছেন কাফেলার সেই ৯৯ . ৯৯৯ ‘কবি’দের
দিকে। যাঁরা ‘পৃথিবীর রঙ রূপ কিছুই দেখলেন না, গভীরের অনুভব শূন্য। যাঁদের মরীয়াপনা কবিতায়
ছিল না, ছিল প্রচারে। ছাপাখানা ও খ্যাতির পতাকায়। যাঁদের পক্ষে অক্ষরে নিমজ্জিত
হয়ে বুকে বালিশ চেপে কেবল শব্দবাজি তৈরিই সম্ভব।’ কমল বলেছেন ০
. ০০১ দের কথাও ‘যাঁর স্পর্শে জাগ্রত হয় পরিবেশ। জড়ে
চেতনা, মৃতকে অমৃত। কবি জানেন বৃষ্টির ভাষা, কুন্দ অতসী নিমের ভাষা। ঈগল, শঙ্খচিল,
টুনটুনির। কারণ তিনি একজন পরিবেশ- ভাষাবিদ। ’ শুরুর
গদ্যেই লেখা হয়েছে এই সব।
প্রকৃত প্রস্তাবে নৌকোর ছায়া-১ থেকে ৮ নম্বর অব্দি
লেখাগুলো আমাকে জব্দ করতে পারে না। আমি আকুল হয়ে খুঁজি ‘মিথ্যেকথা’-র কবি কমল
চক্রবর্তীকে। গিমিক-হীন, স্কিম-হীন, পরিকল্পনাহীন। খুঁজি যা ‘না পিষ্টক, না
ঝুমঝুমি’। এবং কি আশ্চর্য, লো এন্ড বিহল্ড, ছায়ানৌকোয় শেষ পর্যন্ত পেয়ে যাই তাকে।
প্রথম পাঠেই আবার সে মুগ্ধ করে। সেই ব্র্যান্ড কমল। সেই রক্ত-মাংস-ঘৃণা-প্রেম-আশ্লেষ-ধিক্কার।
সেই শালবন, জলপিপি। যাবতীয় বিছানা বালিশে জড়িয়ে ধরা কবিতা। লোহায়, বোল্ডারে , ….সারা গায়ে শূয়োরের তেল, …. ফুল সাইজ ট্রমা!
তো এই হোল পুরনো কবিতায় সুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরিয়ে
আসা ? -আমি চমকিত হই, স্যালুট করি।
‘যে দেশে হরিদ্বার আর বারাণসী, ...শালপাতায় মাংস,
কালোজিরে, দোক্তাপাতা, মদ, ...আর সারারাত মাদল, ...যেখানে ব্যাভিচার, দালাল,
ঘুষখোর বজ্জাত, ... যেখানে ষ্টীল প্ল্যান্ট, ঢালাই মেশিন, আর ফোরম্যান, ... যেখানে
শ্মশান কালী, জানালায় গেছোভুত আর নিশি পাওয়া, ... যে দেশে অসংখ্য সাপ আর সবুজ
কাছিম’, ... সেই দেশের কবির নাম কমল চক্রবর্তী। এই সমস্তটা নিয়েই কবিতার রম্যভুমি তার। সমস্ত তত্ত্ব কথা ও ইজম থেকে দূরে।
কমলদার জীবন ও কবিতার পরিমণ্ডলের কাছেকাছে, আনাচে
কানাচে আমি দীর্ঘ দিন থেকেছি। কবি কমল চক্রবর্তী আমার প্রিয় কবিদের অবশ্যই একজন। শালবনে,
কবিতার ক্যাম্পে, বিবাহ বাসরে, শবযাত্রায়, আদালতে, হার্ডকোর কৌরবে, আমি তার দীর্ঘ
দিনের সঙ্গী। আজ ছায়ানৌকোয় এসে আমি দেখছি কীভাবে সময়ের ক্ষতচিহ্ন ও প্রলেপ লেগেছে
তার জীবনে। কীভাবে নির্মাণ। ছায়ানৌকোয় এসে বোঝা যায়, ‘কি বিশ্রী যৌবন ছিল, যা
হারিয়ে গেল জাহ্নবী- হাওয়ায়’। - তবু আজও সে আছে ‘নদী-পাগলী মেয়েদের গোপন খেলায়’! সেই সব মেয়েরা, যারা
‘ফুরফুরে’। যাদের ‘মায়ের আদলে হাসি, থুতনি চোয়ানো অশ্রু’। আর কেউ কেউ ‘দামড়ি
পিশাচ’।
কবি কমল তাঁর পাঁচটা বইয়ের ( ফার্নেস, জল, মিথ্যেকথা,
সরল রেখা, গার্ল ফ্রেন্ড) নির্বাচিত কবিতাগুলোকে নিয়ে এসেছেন এক নৌকোর ছায়ায়। আদি
কবিতার নামগুলো একই রাখা হয়েছে এই রিমেক সিরিজে। ছায়ানৌকোর প্রতিটি কবিতার নীচেই
দেওয়া আছে মূল বইয়ের সেই নামী কবিতার পৃষ্ঠা সংখ্যার নির্দেশ, যাতে আগ্রহী পাঠক ও
গবেষক মিলিয়ে নিতে পারেন মূল লেখাটার সঙ্গে এই পুনর্নির্মিত লেখাটা। অর্থাৎ
দুভাবেই পড়া যায় কবিতাগুলো।
কমলদার ‘মিথ্যেকথা’ আমার প্রিয় কবিতার বইগুলোর একটি। দেখা যাচ্ছে ছায়ানৌকোর অনেক কবিতাই প্রধানত জল ও
মিথ্যেকথার নির্বাচিত কবিতার পুনর্নির্মাণ। মিথ্যেকথা যখন লেখা হয়, তখন প্রায় প্রতিটি
সন্ধ্যাই কাটতো আমার ও কমলদার দ্বৈত আড্ডায়। সপ্তাহে একদিন বসা হত স্বদেশদার
বাড়িতে। কমলদা পড়তো তার দারুণ নতুন লেখা গুলো, ......কাপ প্লেট, লাল টম্যাটো ! মনে
পড়ে তার আক্ষেপ, ‘আমাদের প্রেস নেই, সেক্সি যুবতী নেই’!
- ছায়ানৌকোর সাথে মিলিয়ে নিতে আমি তাই বুক র্যাক
থেকে নামিয়ে আনলাম মিথ্যেকথা বইটাই। আর পর পর অনেকগুলো কবিতা পড়লাম। বোঝা
গেল ছায়ানৌকোয় পুনর্নির্মিত লেখা গুলো কবিতার ছায়া মাত্র। মূল কবিতার কাছে তাদের
অ্যাবস্ট্রাক্সান, তানকারী, রোয়াব, -তাদের
বাইসেপ্স ও চিকবোন, কোথাও অনেকটাই কৃশকায়, রক্তাল্পতা। মিলিয়ে পড়তে গিয়ে আমার এরকম
মনে হোল।
যেমন মূল কবিতা ‘কবি এখন কারখানায় যাচ্ছে’ । মিথ্যেকথা বইতে এই কবিতায় ছিল এরকম আবহ : ‘কবিকে একটা
ঝিমিয়ে পড়া লেদ মেশিন ডাকে’ ...... ‘একটা মিলিং কাটারের দাঁতে সারারাত ময়েশ্চার
জমেছে’ ...... ‘ক্যাঙ্গারুর পেট থেকে লাফিয়ে নামছে ইনগট’ ......‘লোহা টলমলে পায়ে
হাঁটা, হাঁটতে হাঁটতে বিবর্তন’ ..... ‘বাতাসে বাতাসে অস্পষ্ট কার্বন’ ..... ‘ওয়াগন
বোঝাই লোহা পাথর' .... এই মতো।
এই কবিতা একই নামে ছায়ানৌকোয় পুনর্নির্মিত হয়েছে দেখা গেলো। ছায়া নৌকোর কবিতায়
কবি যখন কারখানায় যাচ্ছে তখন আর লেদ মেশিন তাকে ডাকে না। সেখানে লোহার ইনগট নেই,
মিলিং কাটারের দাঁত নেই। লোহা টলমলে পায়ে হাঁটা নেই। আর ওয়াগন বোঝাই লোহা পাথরের
বদলে এখন এসেছে ওয়াগন বোঝাই মুণ্ডু, কারও হাত কারও পা! অদ্ভুত।
কবি এখন হুটারে নির্বিকার! কিন্তু তবুও সে কারখানায় যাচ্ছে কেন? আমরা তো আরও
একাত্ম হয়েছিলাম গিয়ার ও মিলিং কাটারের দাঁতে ময়েশ্চার জমতে দেখা ভারী বুট পরা সেই
কবিকে দেখে, যেমনটা মিথ্যে কথায় লেখা হয়েছিলো। ...এখন মেশিনের বদলে কবিকে ডেকে
নিচ্ছে নিভু বাতাসিয়া আর বনের কাহিল দোপাটি। কবিকে আজ ‘জল-জিরা ডাকছে’! তুলিতে
অন্য রঙ। একটা অন্য সুর বাজছে সাব-উফারে।
বোঝা যায় ছায়ানৌকোর কবি এখন অনেক ক্লান্ত।
কোথায় যেন জল ঢুকে গেছে ভেতরে। ভিজে গেছে বারুদ। ‘জল’ নামক কবিতায় একদিন ‘লিগিরদা-লিগিরদা-বাহা’
বয়ে গিয়েছিল যে জল, এখনও তার স্মৃতি রয়ে গেছে, কিন্তু এখন তা ‘দূর জল-প্রপাত’। - এ
এক বাহিত জীবন, এর আবহ অনুষঙ্গ গুলো সময়ের সাথে দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পালটে যাচ্ছে
দৃষ্টিকোণ।
আসলে, এই লেখা যখন কমলদা লিখছে তখন সে আর টাটা মোটর
কারখানায় বদ্ধ মেশিন রুমে গলদঘর্ম হয়ে শিফট ডিউটি করে না। ‘ইঞ্জিন টেস্টিং বে’
থেকে অনেক দূরে ভালোপাহাড়ে এখন সে ব্যক্তিগত সাজানো জংগল-খামারে
শিরিষ-সেগুন-মহানিম–অর্জুনের গায়ে গায়ে পোষা হাঁস-মুরগি-ছাগল- কাকাতুয়াদের মাঝে
সংসার পেতে লক্ষ্য করছে অন্য এক চলমান জীবন। এই তার নতুন সঙ্ঘারাম, যা তাকে
চিনিয়ে দিচ্ছে তার প্রকৃত সুর ও শিকড়। আর
কবিতায় লাগছে এক ভিন্ন রঙ।
কমল চক্রবর্তীর কবিতার একটা প্রধান অংশ জুড়ে থাকে প্রকৃতি। আর থাকে যুবতী
মেয়েরা। ‘মেয়েরা, শুধু তোমাদের জন্য এই দীর্ঘ-কবিতা’। আর একদিন ভোজালির মতো খিদে নিয়ে দাঁড়ায় যুবতী। -
কিন্তু আজ শুধু আলোর আঁকিবুঁকি। সূর্যাস্ত। - ‘যৌবন হারিয়ে গেলো জাহ্নবী হাওয়ায়’। ‘এত
যে কবির কান্না, .. বোঝ অভিমান’। প্রান্তরে সূর্য ঢলে, রাখাল। আর ‘তার গরু ভেড়া
কুয়াশা নেশায় তিমিরে ঝিমোয়’। .... ‘কুয়ো তলায় কবি কাঁদছেন’ !
আমি দেখতে চেয়েছিলাম মিথ্যেকথার সেই বিখ্যাত কবিতাগুলোর পুনর্নির্মাণ কেমন
হয়েছে। সেই ‘অষ্টাদশ পেয়ালায় পা ফেলে ফেলে
উঠে’ আসা, অথবা ‘জীবনের জন্য ডায়াল এম’। খুঁজে পেলাম তাকে, সেই ‘ডায়াল এম’ কে। এটা ছিল কমল চক্রবর্তীর একটা
বিখ্যাত কবিতা। কিন্তু দেখা গেল তার পুনর্নির্মাণ সম্ভব হয়নি। যা হয়েছে তা যেন এক দুর্বল অনুবাদ । প্রায় লাইন বাই
লাইন, বাংলা থেকে বাংলায় !
এখানেই আমি কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যাই। মনে হয়, কী দরকার ছিল যৌবনের ঐ সব অমোঘ
কবিতার রিমেক, যা আমাদের ছত্রে ছত্রে পরিবর্তন গুলোর সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় ? পুরনো
লেখাকে সামনে না রেখেও লেখা যেতে পারতো আজকের তুলি ও কলমে আজকের নতুন লেখাটা । কিন্তু
লক্ষ্য করা গেলো, নিজের ভিন্ন ভিন্ন বইগুলোর মুখোমুখি হয়ে নানা ধরনের মিশ্র
প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো তার আজকের লেখার টেবিলে। সেই জন্য মিথ্যেকথার রিমেক এবং জলের
বা সরলরেখার রিমেক-এর অভিজ্ঞতা এক নয়।
এটা আমি আবিস্কার করলাম ‘সরলরেখা’ বইয়ের ‘শুঁড়ির মেয়ে’ কবিতাকে পুনর্নির্মিত
দেখে। একটা ভরপুর লেখা, যার সমস্ত লাইনেই আজও আছে কবি কমলের সেই পরিচিত অমোঘ অকাট্য সিগনেচার। এই সেই শুঁড়ির মেয়ে, এখনও যার ‘আঙুর লতায় বুক ঢেকেছে, ডালিম লতায়
নাভি ....এই মেয়েটি চোলাই-খুকু, ...ওর সারা গা গুড়ের মড়াই, ওর হাসি গান চুমু
কান্না দ্রাক্ষা- বৃষ্টি’ ... এই মেয়েটি রহস্য-জাল, এই মেয়েটি আমার কেউ’ ! পুনর্নির্মিত, কিন্তু নতুন তার সেলাইয়ের ফোঁড়। অ্যাপ্লিকের
কাজ।
তেমনি আমি
আবিস্কার করলাম ‘জল’ বইয়ের ‘সুবর্ণরেখা’ কবিতাকে পুনর্নির্মিত দেখে। এটা একটা
অদ্ভুত সুন্দর উচ্ছল কবিতা যার গভীরে রয়েছে গোপন প্রেম আর যৌবনের আর বিদায়ের কথা।
আছে গুপ্ত-স্নান, যৌন-সন্ত্রাস আর
দিব্য-হাহাকারের কথা। কবিতাটা শুরু হচ্ছে, ‘ তুই সুন্দরী, তুই পরিত্রাণ! প্লিজ, তোকে কখনো ছোঁব না।’ ... পরে আছে ‘
ওঁরাও-যুবতী নিয়ে গুপ্ত-স্নান, সাবানের ফেনা।’ ... শেষে,
‘কখনো বেদনা-হুহু বিদায়ের রেখা / তোকে মনে পড়ে, তোকে’ । - একটা চিরকালিন নদী, নাম সুবর্ণরেখা, এই ভাবে
অমর হয়ে রইল তার সোনালি-পালক নিয়ে ! ...যেখানে ‘রক্ত তুলি, বিবাহের বালুবেলা’ !
একক ভাবে ছায়ানৌকো
বইয়ের কবিতাগুলো পড়ে অন্য এক উদ্ভাস আমাকে
স্পর্শ করে। ভালো লাগে দেখে যে বয়সের নুব্জতা তার কলমে এখনও আসেনি। কমলদার পুরনো
কবিতার ঘাটে ঘাটে তার সাথে একই নৌকোয় এতদিন পর মোহগ্রস্তের মতো আমার এই সফর। চারিদিকে যখন আন্তর্জাল মজলিশে ‘শিশি ফাটছে
হাঁড়ি ভাঙছে, ছিপি উড়ছে ভিন্নতর’, তখন
একত্রে আবার এই ‘বোতল ঢালা, তপ্ত গেলাস’! বহুদিন পরে আবারো তাই তাকে নিয়ে বিস্ময়। এখানে
কমলদা লিখেছে ‘দুঃখী মানুষেরা বনে যায়, দূর থলকোবাদ’। আর আমার মনে পড়ছে,
থলকোবাদের সেগুন-জঙ্গলে জ্যোৎস্নায় ঝরা
পাতা মাড়িয়ে অনেক বছর আগে কমলদা ও আমি। আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছিলাম, কীভাবে নিঃশব্দে সময় বয়ে
যাচ্ছিলো জঙ্গল-মহলে, নির্জন সন্ধ্যায় । সময়ের
সেই ছাপ আজ কবিতায়, জলে। নদীবাহিত এলোমেলো
হাওয়ায় কাঁপছে কবিতার ছায়া, ছায়ানৌকো।